(স্পয়লার এলার্ট )
মুভিটা দেইখা থাকলে পড়েন , না হলে ভাইছা এখনই বিদায়।
আসল কথায় আসি।হাওয়া সিনেমাটা দেখার পর অনেককেই বলতে শুনসি, গল্পটা স্ট্রং না। নিজেও ঐটাই ভাবসিলাম। আরো প্লট থাকলে ভালো হতো, ক্লাইমেক্সগুলা আরেকটু কড়া হলে সিনেমাটাও কড়া হতো, এতসব হতো-এর মাঝে হঠাৎ-ই মাথায় আসলো হাওয়া তো কোনো থ্রিলার জনরার মুভি না, মাইথোলজি ও এই সিনেমার সিগনিফিকেন্ট কোনো জনরা না , মিস্টেরি-ও না ।গল্পের স্বার্থে এই সিনেমায় মাইথোলজির আশ্রয় নেওয়া হয়েছে, কিন্তু মাইথোলজি তো এই সিনেমার বেইস/ভিত্তি না। প্রথম থেকেই হাওয়ার পরিচালক সুমন বলে আসছে, এইটা অনেক সহজ একটা গল্প।সবাই বুঝবে এমন একটা গল্প। ড্রামা জনরার একটা সিনেমা, এই সিনেমায় তো রহস্য , মিস্টেরি-ই আসল না। এই সিনেমা বিচার করতে হবে ,কত সুন্দর করে পরিচালক বা নির্মাতা গল্পটি বলেছে তার উপর। এই জনরার মুভিতে হাস্যরস থাকবে, মনস্তাত্তিক দ্বন্দ থাকতে পারে, গল্পের চরিত্রদের মধ্যে যে মানবিক বৈশিষ্ট্য আছে-লোভ,লালসা,যৌনতা,হিংসা তা থাকবে, যেই সমাজের গল্প তার পারিপার্শ্বিক অবস্থা, আর্থিক অবস্থা সুন্দর করে তুলে ধরা হবে। এইতো ড্রামা জনরার মুভি থেকে আশা করা যায়।
আচ্ছা এইবার আসি, হাওয়া আমাদের কি মেসেজ দিতে চাইসে।
ধরেন, অমুক এলাকার এমপি বহুত প্রভাবশালী, ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় বহুত খুনখারাবি করসে। চুরি,চাঁদাবাজি, ধর্ষণ কোনো কিছু বাদ দেয় নাই। কিন্তু ২০ বছর ক্ষমতায় থাকার পর তার মনে হইলে, "বাজি,আর না, তওবা, তেইল্লা কানটানা"
উনি এইসব ছাইরা হালাল ব্যবসা শুরু করলেন। ভুইলাই গেলেন অতীতে উনি কি কি করসেন । দাড়ি রাইখা, টুপি জোব্বা পইড়া উনারে এখন আর চিনাই যায় না , দেইখা বা কথাবার্তায় বুঝাই যায় না এক আমলে উনি কি কি করসিলেন। উনিও উনার নতুন জীবনে অভ্যস্ত। প্রতিদিনের মত উনি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে আসলেন,খুব নরমালি কাজ তদারকি করতেসিলেন, কিছুক্ষণ পর দেখলেন ,যে মেয়ের বাপরে উনি ১৫ বছর আগে মাইরা ফেলসেন চাঁদা না দেওয়ার জন্য, যে মেয়ে উনার লালসা থেকে কোনো রকমে পালায়ে বাঁচসে , সেই উনার সামনে বন্দুক নিয়া দাড়ায়ে আসে ,সেই মেয়েই এখন বর্তমান এমপি। ১৫ বছর আগে যেই মেয়ের কিচ্ছু ছিল না, উনিও তারে নিয়া দুইটাবার আর চিন্তা করেন নাই, ভাবসেন ফকিন্নির মাইয়া, সে আবার উনার কি করবে, সেই এখন উনার সামনে উনার হোগামারার জন্য দাঁড়ায় আসে। উনি উনার পাপ হয়তো ভুইলা গেসেন, কিন্তু প্রকৃ্তি তো উনারে ক্ষমা করে নাই বাছাধন, সে উনার সামনে এমন একজনরে অসীম শক্তি দিয়ে নিয়ে আসছে, যে কিনা প্রকৃ্তির আশীর্বাদ ছাড়া এতদূর আসতে পারতো না।যেই মেয়ের একসময় কিছুই ছিল না,সেই এখন এমপি, ব্যাপারটা অসম্ভব/আলৌকিক মনে হয় না?
এইবার পুরান এমপি সাহেব আবার তার আসল রূপ দেখানো শুরু করলো, খুন খারাবি, হোগামারামারি আবার শুরু কইরা দিলো ,আবার এলাকায় ত্রাস সৃষ্টি করে ক্ষমতায় আসার জন্য। তার কারণ হল মানুষ যতই মুখোশ পড়ুক, মাইনকার চিপায় পড়লে আবার নিজের পুরান রূপ দেখাইতে বেশি দেরী করে না। কিন্তু শেষ পর্যন্ত পুরান এমপি সাহেব হোগামারা খায়াই গেল, রাস্তায় মধ্যরাতে চিত হইয়া জিহ্বা বাহির কইরা লেটায়া পইড়া থাকতে দেখা গেল তারে। প্রকৃ্তি তার প্রতিশোধ ঠিকই নিল। এই গল্পই যদি মেজবাউর রহমান সুমন বলতেন তাহলে কেউ আর টাকা দিয়ে হলে যাইতো না, উনারেও কেউ অসম্ভব মেধাবী বলতো না। উনি উপরের গল্পটাই বলেছেন, কিন্তু ভিন্ন আঙ্গিকে, নিজের অসাধারণ সৃজনশীলতার পরিচয় দিয়ে। উপরের গল্প আর হাওয়া সিনেমার শিক্ষা একই, মেসেজ একই।
আপনি আপনার থেকে দুর্বল কারো হোগা মাইরা নিশ্চিন্তে আসেন যে ঐ ফকিন্নি আপনার কি করতে পারবে, কিন্তু প্রকৃ্তি তো ভুইলা যায় নাই। জীবনের কোনো না কোনো পর্যায়ে হোগামারা টা আপনি ঠিকই খায়া যাবেন, আর খাবেন ও খুব সারপ্রাইজিংলি।
আসা যাক হাওয়া সিনেমায়।
হাওয়া সিনেমার চানমাঝি এককালে ছিল ডাকাত। যেই মেয়ের বাপরে ডাকাতি করতে যায়া মাইরা ফেলসিলো, যেই মেয়েরে ভোগ করতে চাইসিলো, ঐ মেয়েই অনেক বছর পর দেবীর আশীর্বাদে অসীম ক্ষমতা নিয়ে আসছে পিতৃ-হত্যার প্রতিশোধ নিতে। চানমাঝি কিন্তু তার অতীত ভুইলাই গেসিলো, এখন সে পুরোদমে জেলে সর্দার, কেমনে মাছ ধরবে মাঝ সমুদ্রে , কোনদিন ফিরা যাবে ,ঐসব নিয়াই তার চিন্তাভাবনা। আশপাশের অন্য জেলেরাও বুঝতাসে না এক সময় কত্ত বড় বাইঞ্চোদ ছিল চানমাঝি। কিন্তু ঐ যে প্রকৃ্তি, উনি কিন্তু ভুলেন নাই। গুলতিরে দান করলেন আলৌকিক ক্ষমতা, সে মাছ হইয়া মাঝ সমুদ্রে ধরা দিলো চানমাঝির জালে। আর শেষ পর্যন্ত সাপ হইয়া দংশন করলো চানমাঝিরে। এর মাঝখানের গল্পটাই এত সুন্দর করে মেজবাউল হক সুমন বলেছেন, তা লিখার যোগ্যতা আসলেই আমার নাই। এইখানেই তার মত একজন নির্মাতার মুনশিয়ানা। মাঝ সমুদ্রে হিংসা , মনস্তাত্তিক দ্বন্দ, লালসা, লোভ , ভয়, যৌনতা ,মিথোলজি, প্রেম, আত্মত্যাগ, বন্ধুত্ব , কুসংস্কার, হাস্যরস , প্রতিপত্তি , সরলতা কি সুন্দর করে যে তিনি ফুটিয়ে তুলেছেন মোরাল অফ দ্যা স্টোরি ঠিক রেখে। মনে হয়েছে, পুরো সিনেমাটাই একটা ক্যানভাস আর তাতে রঙ তুলি দিয়ে অপরূপ সুন্দর এক ছবি এঁকেছেন মেজবাউল হক সুমন। সাথে অভিনেতাদের অভিনয় নিয়ে কথা না বলাই ভালো। কখনোই মনে হবে না যে, সিনেমা দেখছেন। অভিনয়শিল্পীরা এতটাই চরিত্রের মধ্যে ছিল যে ,মনে হবে কোনো সত্য ঘটনা কেউ ভিডিও করে রেখেছে, তাই দেখছেন। এতটাই সাবলীল ছিল উনাদের অভিনয়।পুরো ২ ঘন্টা সমুদ্রেই ভ্রমণ করবেন চানমাঝির ট্রলারে।শুধু "সাদা সাদা কালা কালা" গানটাই তো যথেষ্ট চোখে দেখে আর কানে শুনেই নেশা ধরায় দেওয়ার জন্য। ৩/৪ মিনিট আপনি সিনেমা হলে থাকলেও আপনার মন থাকবে মাতাল জেলেদের সাথে। সিনেমাটোগ্রাফি, কালার গ্রেডিং, সিকুয়েন্স, গান, ডায়ালগ, ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক-সবই ছিল সেরা।
সবশেষে আসি রেটিং-এ ,
আমার মতে হাওয়া ৯.৫/১০ ডিজার্ভ করে।
হাওয়া বাংলাদেশে সিনেমা ইন্ডাস্ট্রিতে একটা মাইলফলক হয়ে থাকবে।
পুরো লিখা যদি পড়ে থাকেন , তাহলে এতক্ষণে আপনার মাথায় প্রশ্ন আসতেই পারে ,এত বিশাল একটি লিখা এত কষ্ট করে লিখলাম কেন ।
প্রথমত, ভালো জিনিসের প্রশংসা করা উচিত। তাছাড়া অন্য দেশের সিনেমা
দেখে আর কত। অন্য দেশের ,অন্য ভাষার সিনেমা কেন জানি নিজ দেশের সিনেমার ফিল দেয় না। মনে হয় না যে, গল্পটা তো আমাদের। পাশের দেশ ইন্ডিয়ার সাথেও আমাদের কালচার,ট্রেডিশানের অনেক পার্থক্য। তাই নিজ দেশেই হাওয়ার মত মানসম্পন্ন সিনেমা তৈরি হোক। তাই যতভাবেই সম্ভব মেজবাউল হক সুমনদের মত গুনী নির্মাতাদের উৎসাহিত করা উচিত, তাদের সাপোর্ট করা উচিত।
জয় হোক বাংলা সিনেমার।
ইতি
-মারসাদ সিনেমাবোদ্ধা মহিউদ্দিন
Comments
Post a Comment